এসএম শামীম: নেত্রকোনা-১ (কলমাকান্দা-দুর্গাপুর) আসনে আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনের তৃণমূল কর্মীরা আজ বিপর্যস্ত জীবনযাপন করছেন। যারা একসময় দলের জন্য জীবন বাজি রেখেছেন, সংগঠনকে শক্তিশালী করতে রাজপথে লড়াই করেছেন, আজ তারাই নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। তারা জানাচ্ছেন, দলের শীর্ষ নেতাদের কাছ থেকে কোনো সহায়তা না পেয়ে আজ তারা অন্ধকারে নিমজ্জিত। সবচেয়ে বেশি দুর্দশায় আছেন ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ এবং কৃষক লীগের কর্মীরা।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক দফা দাবির মুখে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যান। এরপর থেকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ওপর ব্যাপক হামলা-মামলা এবং দমন-পীড়ন শুরু হয়। নেত্রকোনা-১ আসনেও সেই পরিস্থিতি চলে আসে। একাধিক কর্মী ও তাদের পরিবারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো, যারা এতদিন দলের হয়ে কাজ করেছে, তাদের পাশে এখন দলের শীর্ষ নেতারা দাঁড়িয়ে নেই। তাদের একটাই প্রশ্ন—‘আমরা দলের জন্য জীবনের অনেক সময় দিয়েছি, কিন্তু এখন আমাদের দিকে দলের কোনো নেতার দৃষ্টি নেই।’
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে, ফলে সাংগঠনিকভাবে ছাত্রলীগ এখন অবৈধ। এর ফলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সরকারের দমন-পীড়নের শিকার হচ্ছেন, এবং কোনো সাংগঠনিক সহায়তা না পেয়ে অনেকেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। রাজপথে যারা এক সময় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তারা আজ একা হয়ে গেছেন। তারা জানাচ্ছেন, দলীয় আদর্শের জন্য তারা এখনও লড়াই করছেন, তবে কোনো সহায়তা ছাড়া তা করা সম্ভব হচ্ছে না। এক সময় ছাত্রলীগ ছিল আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন, কিন্তু এখন তারা ‘অবৈধ’ হয়ে যাওয়ায় কোনো কার্যক্রম চালানো যাচ্ছে না। এর ফলে অনেক কর্মী নিজেদের জীবন ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন।
অপরদিকে, আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা এখন আড়ালে চলে গেছেন। দীর্ঘদিন ধরে যারা দলের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছেন, যাদের ঘামে রাজনীতি গড়ে উঠেছিল, তারা এখন সরকারের নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার। এলাকার নেতারা চুপ, দূরবর্তী নেতারা কোনো সাহায্য নিয়ে আসছেন না। কর্মীরা তাদের অবস্থার কথা জানালেও, দলের শীর্ষ নেতাদের কাছ থেকে কোনো সাহায্য পৌঁছাচ্ছে না। বর্তমানে একাধিক কর্মী নিজের জীবন ও পরিবারের নিরাপত্তার জন্য ভয়ে-আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
এছাড়া, যারা পরিবার নিয়ে রয়েছেন, তাদের জন্য জীবনযাপন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। একাধিক কর্মী জানাচ্ছেন, তাদের ঘরে এখন খাবার নেই, সন্তানদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, এবং অনেকেই চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত। এমন পরিস্থিতিতে তারা দলীয় নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন—যেন তাদের পাশে দাঁড়ানো হয়, যেন তাদের দুঃসময়ে কেউ সাহায্য করে। এক সদস্য জানান, “আমাদের প্রতিদিনের আয়ে সংসার চলে, কিন্তু এখন কোন কাজ নেই, অন্নের সংকট চলছে, অথচ কোথাও কোনো সাহায্য পাওয়া যাচ্ছে না।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি দলের শীর্ষ নেতারা তৃণমূল কর্মীদের জন্য কার্যকরভাবে কোনো সহায়তা না দেন, তবে ভবিষ্যতে দলের জন্য বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি হতে পারে। যারা একসময় আওয়ামী লীগের মূল শক্তি ছিলেন, তাদের যদি অবহেলা করা হয়, তাহলে দল ভাঙনের দিকে চলে যেতে পারে। এক প্রবীণ কর্মী বলেন, “আমরা যারা রাজপথ কাঁপিয়েছি, তাদের আজ ভুলে গেলে দলের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।”
এখন তৃণমূল কর্মীরা তাদের নেতাদের প্রতি একটি আহ্বান জানাচ্ছেন, তা হলো—তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে, তাদের কথা শুনতে হবে। দলকে পুনর্গঠিত করতে হলে তৃণমূল কর্মীদের সঙ্গী করতে হবে, যাতে আগামী দিনে সংগঠনটি আবারও শক্তিশালী হতে পারে।
নেত্রকোনা-১ আসনের আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগের কর্মীরা এখন সংকটময় পরিস্থিতিতে আছেন। দলের জন্য তাদের ত্যাগ এবং সংগ্রামের পর, এখন তারা নিঃস্ব। তাদের একটাই দাবি—দলের শীর্ষ নেতারা যেন তাদের পাশে দাঁড়ান, তাদের দুঃসময়ে সাহায্য করেন। যদি তৃণমূল কর্মীদের অবহেলা করা হয়, তাহলে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।